দুর্নীতির(Corruption)-সংজ্ঞা।

অনেক উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদস্থ, উচ্চবিত্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি সম্পর্কে তেমন ধারনা রাখেননা বা তা তাদের থাকেনা। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার্স/ডক্টরেট ডিগ্রীধারী ব্যক্তি, যাদের শহরে-গ্রামে অনেক জমি-জমা আছে, তারা খাজনা. দাখিলা, পর্চা, খতিয়ান, দলিল, ইত্যাদি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেননা। সরকারী-বেসরকারী অফিস আদালতের অনেক নিয়ম কানুন সম্পর্কে ভাল ধারনাই তাদের অনেকের নাই।

চরিত্রহীনতা বলতে অনেকেই এখনও অবৈধ যৌনকাজকেই বুঝে। যদিও এর (চরিত্রহীনতা) সংজ্ঞা ও ক্ষেত্র ব্যাপক। শুধু অবৈধ যৌনকাজই চরিত্রহীনতা নহে। বেপর্দা(নারী-পুরুষের উভয়ের), ইভটিজিংসহ ইচ্ছাকৃতভাবে বেগানা নারী ও পুরুষ পরস্পরকে তার সংবেদনশীল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রদর্শন করে, যৌনতা প্রকাশ পায় এরূপ কথা বলে প্রলোভিত, প্ররোচিত, প্রভাবিত করা বা করার চেষ্টা করা, পর্ন ছবি/ভিডিও/গল্প পড়ে যৌনভাবে উত্তেজিত হওয়া, ইত্যাদি সবকিছুই চরিত্রহীনতার পর্যায়ে পড়ে। ঘুষ, দুর্নীতি, মিথ্যা, ইত্যাদিও চরিত্রহীনতার অংশ।

একইভাবে দুর্নীতি(corruption) বলতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত অনেক লোক এখনও ঘুষরূপ নগদ অর্থ দেওয়া-নেওয়াকে বুঝে। যদিও এর (দুর্নীতি) সংজ্ঞা এবং ক্ষেত্রও ব্যাপক। তাই দুর্নীতির কিছু সংজ্ঞা আমরা আইন ও বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে জেনে নিই।

ক।১৯৪৭সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ ২নং আইনের সংক্ষিপ্ত বিবরনের(synopsis) ১ম দুটি উপাদানে অপরাধজনক অসদাচরন(misconduct) ও অপরাধের উদ্দেশ্য mensrea বা criminal intention-ই দুর্নীতি-একথা বলা হয়েছে।(দ্রস্টব্যঃ-দুর্নীতিদমন কমিশন বিষয়ক আইন-মুহম্মদ সাইফুল আলম, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক মহাপরিচালক, দুদক। প্রথম প্রকাশ- আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা-৫৫) অসদাচরনের সংজ্ঞায় “যে আচরন ভাল নয় তাহাই অসদাচরন, বা যাহা করা উচিৎ কিন্তু করেন না বা যাহা করা উচিৎ নহে তাহা করাই অসদাচরন।” এ দুটি প্রধান উপাদানে সরকারী সম্পদ আত্মসাৎ করা, ঘুষ, পার্সেন্টেজ, কমিশন বা উপঢৌকন গ্রহন ইত্যাদির কথা বলা নেই। অর্থাৎ ঘুষ খাওয়া,  সরকারী সম্পদ আত্মসাৎ করা, পার্সেন্টেজ, কমিশন বা উপঢৌকন গ্রহন করা একমাত্র দুর্নীতি নহে। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক  mensrea বা criminal intentionally অবৈধ কাজ করা বা বৈধ কাজ না করাই সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। এটা(সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক  mensrea বা criminal intentionally অবৈধ কাজ করা বা বৈধ কাজ না করা) সবচেয়ে বড় দুর্নীতি বলেই এটাকে আইনের(১৯৪৭সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ ২নং আইন) উপাদানগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে রাখা হয়েছে।

খ। ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪,আসুন, আগে দুর্নীতিকে স্বীকার করি।বিমল সরকার। http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2014/12/27/167911

..Top of Form

……. ১০ জুলাই ১৯৭৫ বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে দুর্নীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘কেবল পয়সা খাইলেই দুর্নীতি হয় না। বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করা যেমন দুর্নীতি, কাজে ফাঁকি দেওয়াও তেমনি দুর্নীতি। একইভাবে নিচের অফিসারদের কাজ না দেখাটাও দুর্নীতি।……….  (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১১-০৭-১৯৭৫)।লেখক : কলেজ শিক্ষক।

গ। জানুয়ারি ১৯, ২০১৫, প্রশাসনে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি। http://www.jugantor.com/old/sub-editorial/2015/01/19/207085  মোঃ ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মতবাদ এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে কল্যাণকর লিখিত বা অলিখিত নির্দেশনা বা প্রথা বা নৈতিক অনুশাসনই নীতি। নীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদির বিচারবোধ। নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ন্যায়-পরায়ণতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় সুনীতি এবং সুনীতির বিপরীত বা পরিপন্থী কাজই দুর্নীতি।

সুতরাং বলা যায়, ভালোমন্দবোধসম্পন্ন নৈতিক শৃংখলার পরিপন্থী এবং প্রতিষ্ঠিত নীতি আইন বিরুদ্ধ কাজই দুর্নীতি। স্বজনপ্রীতি, প্রিয়তোষণ, দলীয় বা গোষ্ঠীতোষণ, চতুরতা, কূটকৌশল ইত্যাদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে দুর্নীতিমূলক অপরাধ হলেও দেশের ফৌজদারি আইনে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়। দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে আর্থিক দুর্নীতিকেই কেবল দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যার কারণে আর্থিক দুর্নীতি নিয়েই সমাজে হৈচৈ বেশি। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি নিয়ে তেমন আলোচনা-সমালোচনা আমরা লক্ষ্য করি না।  অথচ আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি অনেক ভয়াবহ এবং সমাজে এর পরিণতিও মারাত্মক।……..

ঘ। সরলগরল-সুপ্রিমকোর্টে ‘ঘুষ’, টিআইবি ও মাহমুদুল ইসলাম। মিজানুর রহমান খান |  তারিখ: ০১০২২০১১ ……… http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2011-02-01/news/127947  ওই কমিটির কাছে দুর্নীতি বা করাপশন যেন টাকা পয়সাসর্বস্ব একটা বিষয়। মার্কিন পণ্ডিত হেনরি ক্যাম্পবেল ব্লাকের অভিধানে লেখা, দুর্নীতি মানে ক্ষমতার অপব্যবহার।দায়িত্বের, এখতিয়ারের অপব্যবহারও দুর্নীতি।আইনের অপব্যাখ্যাও দুর্নীতি।গুডফেইথছাড়া যে যা করবেন তা দুর্নীতি। আইনকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙতে, থেঁতলাতে আমরা দেখি। এই আইন কখনো সংসদের এবং আদালতেরও তৈরি করা। মুখ বদলায়, আইনের প্রয়োগ বদলায়। মুখচিনে খাদিম কথাটি অনেকেই জানেন। তাঁরা জানবেন, মুখচিনে আইন নামের খাদ্যও বিলানোরযোগ্য। এসবই দুর্নীতি। অতিরঞ্জন হলেও বলব, এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার কাছে আর্থিক দুর্নীতি তুচ্ছ। আমরাও টিআইবির ধারণা জরিপের সীমাবদ্ধতা দেখি। কারণ, তারা বিচারবিভাগের দুর্নীতিকে শুধুই টাকার অঙ্কে পরিমাপ করতে প্রয়াস পেয়েছে।………

ঙ। –খোলা হাওয়াদুর্নীতি বিদেশি সাহায্যকে না বলতে শিখুন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম | তারিখ: ১১০৭২০১২……….বিদেশের এক শহরে দেখেছিলাম, ব্যস্ত চৌরাস্তার ওপর দাঁড়ানো এক উঁচু দালানের গায়ে লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লেতে দেখানো হচ্ছে প্রতি মিনিটে বিশ্বের জনসংখ্যা কতটা বাড়ছে। সংখ্যাগুলো ক্রমাগত লাফিয়ে বাড়ছে। যদি ঢাকার কোনো দালানে আমাদের দুর্নীতির ঘটনার প্রতি মিনিটের হিসাবটা এ রকম এলসিডিতে দেখানো হতো, তাহলে সংখ্যাগুলো এত দ্রুত বাড়ত যে কেউ পড়তেও পারত না। অথবা পুরো ডিসপ্লেটাই দম হারিয়ে নষ্ট হয়ে পড়ত। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলে, এক আর্থিক দুর্নীতিকেই যদি আমরা প্রধান সূচক হিসেবে ধরি, তাহলে আমাদের টেক্কা দেওয়ার মতো দেশ বিশ্বে কমই আছে। তবে দুর্নীতি তো শুধু আর্থিক নয়, দুর্নীতির আরও অনেক পরিচয় আছে, সংজ্ঞা আছে, সেগুলো যোগ করলে আমরা অবশ্যই দুর্নীতিঅলিম্পিকের মেডাল দৌড়ে অনেক এগিয়েই থাকব।…….[সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ]

চ। প্রথম আলো-৩০-০৩-২০১৬

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/814576/

Bottom of Form

দায়িত্বে অবহেলা কর্মস্থলে অনুপস্থিতিও দুর্নীতি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, সরকারি কোষাগার থেকে বেতন নিয়ে ঠিকমতো সেবা না দিলে সরকারি কর্মকর্তা যেই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে দুদক। দায়িত্বে অবহেলা ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতিও এক ধরনের দুর্নীতি।

প্রায় সকলের সংজ্ঞায়/বক্তব্যেই আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে অন্য দুর্নীতির(বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, শ্রেনীস্বার্থ, গোষ্ঠিস্বার্থ, ইত্যাদি) ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে।  (কৃতজ্ঞতা প্রকাশঃ-কালের কন্ঠ, যুগান্তর, প্রথম আলো)।

Related posts