লাওয়ারিশ নিম্ন আদালত, তুঘলকি কান্ড

[ইত্তেফাক-০৯ জুন ২০১৫-আইন কমিশনের অভিমত-বিচার বিভাগের ভঙ্গুর দশা।……….আইন কমিশন মনে করে, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই কেবল মামলার সংখ্যা কমবে না। কমিশন এ ব্যাপারে ১২ দফা করণীয় উপস্থাপন করেছে। মামলা নিষ্পত্তি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি মনিটরিং সেল,………প্রথম আলো মতামতসরল গরলবিচারক নুরুল হুদা মডেল সংসদে আলোচিত হোকমিজানুর রহমান খান | জুন ১৫, ২০১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ ।………… এখন প্রধান বিচারপতির হতাশার কথা শুনে মনে হচ্ছে, এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি। আগের মতোই অচলাবস্থা বিরাজ করছে।…………..কালের কন্ঠ -উপসম্পাদকীয়-১৬ জুন ২০১৫-বিচার বিভাগের বেহাল অবস্থাএ এম এম শওকত আলী-কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন আদালতের বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতার কথা বলেছেন। …লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা]

 

বাংলাদেশের নিম্ন আদালতসমুহের উপর কোন কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবক আছে বলে মনে হয়না। নজরদারী বা নিয়ন্ত্রন আছে বলে ও ধারনা করা যায়না। সম্প্রতি মাননীয় প্রধান বিচারপতি মামলাজট নিরসনে নিম্ন আদালতের বিচারকদেরকে অনুরোধের সূরে কিছু আদেশ-নির্দেশ দিলেও মহাদুর্নীতিবাজ বিশ্ববেহায়া এই বিচারকরা(নিম্ন আদালতের) পাত্তাই দিচ্ছেনা। ২০০৯ইং হইতে ২০১৫ইং এর মে পর্যন্ত প্রায় ৬০(ষাট)লক্ষাধিক  বিচারিক ঘন্টা এরা ফাঁকি দিয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে, কোটি কোটি লোকের সামনে করা এত বড় অপরাধের কোন প্রতিকার নাই। অথচ  ৫০০টাকা ঘুষের জন্য ভূমি অফিসের পেশকারকে জেল দেয় এই দুর্নীতিবাজ বিচারকদেরই একজন।  

ময়মনসিংহের সাবেক জেলা ও দায়রাজজ ও তাঁহার অধীনস্থ বিচারকরা, ঢাকা, কুমিল্লা ও পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ৭জন বিচারক ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৬বছরে যে মামলা নিষ্পত্তি করেছেন, ২৯জন বিভাগীয় স্পেশাল জজ ও স্পেশাল জজরা ঐ ৬বছরে মাত্র তার ২%(দুই শতাংশ)এরও কম মামলা নিষ্পত্তি করে। ২৯জন বিভাগীয় স্পেশাল জজ ও স্পেশাল জজদের এতবড় দায়িত্ব কর্তব্যে অবহেলা তথা দুর্নীতির কোন প্রতিকার নাই। একেই  বলে  তুঘলকি কান্ড।

ময়মনসিংহের সাবেক জেলাজজ(বর্তমানে চট্টগ্রাম)জনাব মুহম্মদ নুরুল হুদার মত ১২ঘন্টা কাজ করে নাহোক, অন্ততঃ যে জন্য তারা বেতন পায়, সেই কর্মঘন্টা কাজ করে হলেও তারা মামলাজটের কিছুটা হলেও নিরসন করবে, এটাই স্বাভাবিক ছিল। এমনকি সংসদীয় কমিটির ময়মনসিংহ পরিদর্শন ও সুপারিশ এবং পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় পড়ে আমরা আশা করেছিলাম এবার বুঝি তাদের(নিম্ন আদালতের বিচারকদের) একটু শুভবুদ্ধির উদয় হবে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি দিয়ে তারা (নিম্ন আদালতের বিচারকরা) বিচারিক ঘন্টা ফাঁকি দেওয়াসহ সকল অনিয়ম দুর্নীতিতে আগের চেয়ে আরও বেশী বেপরোয়া হয়ে গেছে। ২০১৫-র এপ্রিল মাসে ২৯জন বিভাগীয় স্পেশাল জজ ও স্পেশাল জজরা ১২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। এদের প্রথম এবং প্রধান কাজ দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি করা।এইমাসে তাদের সিস্টেম লস ৯৯.৫৯%।(Calculation-জনাব নুরুল হুদা ও তাঁহার অধীনস্থ বিচারকরা ৩বছরব্যাপী প্রতি কর্মদিবসে ১২ঘন্টা কাজ করে প্রতিজন বিচারক প্রতিমাসে গড়ে ৭২টি মামলা নিষ্পত্তি করেন। তাঁরা সরকারী নিয়ম মোতাবেক প্রতি কর্মদিবসে ৯টা-৫টা(৮ঘন্টা) কাজ করলে ৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি করতেন। ঢাকা, কুমিল্লা ও পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ৭জন বিচারক ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৬বছরে(৬৬মাসে ২২০৭৩টি) প্রতিজন প্রতিমাসে গড়ে ৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি করেন। এগুলোকে ভিত্তি ধরলে, অপেক্ষাকৃত অনেক সহজে নিষ্পত্তিযোগ্য দুর্নীতির মামলাও প্রতিজন বিভাগীয় স্পেশাল জজ ও স্পেশাল জজ প্রতিমাসে ৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি করতেন এবং ২৯জন বিচারক নিষ্পত্তি করতেন ২৯x৪৮=১৩৯২টি মামলা। কিন্তু তারা(২৯জন বিচারক) ২০১৫-র এপ্রিল মাসে মাত্র ১২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। অর্থাৎ তাদের মামলা নিষ্পত্তির হার=(১২/১৩৯২)x১০০=০.৮৬%। সিস্টেম লস=১০০-০.৮৬=৯৯.১৪%, ধরি, ৯৯%(নিরানব্বই শতাংশ)।

সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রারের তথ্য মোতাবেক ২০১৪সালে ১৩,০৪,৫৪৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।[যুগান্তর-এপ্রিল ১২, ২০১৫,-আদালতে বসেন না ৮০ ভাগ বিচারকযুগান্তর রিপোর্ট। মামলার জট সহনীয় পর্যায়ে না আনলে বিচার বিভাগের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। মামলা জটের জন্য বিচারকদের আন্তরিকতার অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, আমি দুঃখের সঙ্গে খেয়াল করলাম প্রত্যন্ত অঞ্চলের ৮০ ভাগ বিচারক নিয়মিত আদালতে বসেন না। বসলেও আন্তরিকতার অভাব ছিল।……………ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ২৬ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। বছর মামলা নিষ্পত্তি হয় ১৩ লাখ হাজার ৫৪৪টি এবং দায়ের হয় ১৬ লাখ ৭ হাজার ২৫৫টি। এভাবে চলতে থাকলে এক বছর পর এ জট বেড়ে দাঁড়াবে ৪২ লাখে।…………।] উচ্চ ও নিম্ন আদালতে কোথায় কত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তিনি তা উল্লেখ করেননি। তথাপি যদি উচ্চ ও নিম্ন আদালতের ১২০০বিচারপতি ও বিচারক ধরি, তাহলে প্রতি বিচারকের মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১০৮৭টি, প্রতিমাসে প্রায় ৯৯টি। মাননীয় উচ্চ আদালত আমাদের গবেষনার অন্তর্ভুক্ত নহে বিধায় এনিয়ে আমরা কোন মন্তব্য করবনা। ইহাকে(প্রতি বিচারক প্রতিমাসে প্রায় ৯৯টি) যদি আমরা ভিত্তি ধরি, তাহলে ২৯জন স্পেশালজজ এপ্রিল মাসে ২৯x৯৯=২৮৭১টি মামলা নিষ্পত্তি করতেন।কিন্তু তারা করেছেন মাত্র ১২টি। তাদের মামলা নিষ্পত্তির হার=১২/২৮৭১=০.০০৪১=০.৪১%। সিস্টেমলস=১০০-০.৪১=৯৯.৫৯%।

এটা হবে কেন বা হচ্ছে কেন? হচ্ছে, কারনঃ-দূর থেকে মাননীয় প্রধান বিচারপতি যত আদেশ নির্দেশই দিন না কেন, কাছ থেকে আইন মন্ত্রনালয়ের কোন নজরদারী বা নিয়ন্ত্রন নাই। ১৯৭৫-১৯৯০ছিল সামরিকীকরন, তৎপরবর্তী অদ্যাবধি হচ্ছে দলীয়করন। ফলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রশ্নপত্রফাঁস ও নকল করে পরীক্ষায় পাশ, একইভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ ও পরিশেষে ঘুষ দিয়ে পোস্টিং, পদোন্নতি। এদের না আছে মেধা, না আছে বিচারিক জ্ঞান। না আছে মায়া মমতা, না আছে লজ্জা-শরম। How can you expect justice from them? 

৩০লাখ কেন, বিচারাধীন ৩কোটি মামলা থাকতে পারে। এগুলোত বিচারকরা জীবন বাজি রেখে নিষ্পত্তি করবেনা। কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ন একক এজলাস কক্ষ, পূরো লজিস্টিক সাপোর্ট থাকা সত্বেও, বিচারের অপেক্ষায় নিজের কোর্টে ৫০০থেকে সহস্রাধিক মামলা আছে এরূপ ৮০% বা তারও বেশীসংখ্যক বিচারক ১১-০০টার পূর্বে ও ১৩-৩০টার পরে এজলাসে বসবেনা কেন? অন্ততঃ ০৯-৩০মিনিট থেকে ১৩-০০টা পর্যন্ত বিচারিক কাজে এজলাসে থাকবেনা কেন?

গত একমাস(মে-২০১৫)আমরা ৬৪জেলায় একযোগে কোন্ কোন্ বিচারক সকাল ১১-০০টা বা তার পূর্বে এজলাসে বসে তা পর্যবেক্ষন করি। ১০৯৪জন বিচারকের মধ্যে আমরা ১০০জন বিচারকও পাইনি যারা ১১-০০টা বা তার পূর্বে এজলাসে বসেছেন। যারা ১১-০০টা বা তার পূর্বে এজলাসে বসেছেন, তারাও ৩০মিনিট থেকে দেড়ঘন্টার বেশী(২/১টি ব্যতিক্রম ব্যতীত) এজলাসে ছিলেননা। এবং এরা অপরাহ্নে এজলাসে বসেননি।

কৃতজ্ঞতা-ইত্তেফাক, প্রথম আলো, কালের কন্ঠ, যুগান্তর।

Related posts