বাঁচতে হলে জানতে হবে।

এইডস একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। এটার উৎপত্তি কিভাবে, এর প্রতিরোধ বা আরোগ্য কিভাবে এটা অনেকেই জানেনা। এর সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিরোনামোক্ত(বাঁচতে হলে জানতে হবে) শ্লোগানটি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করে। এটার বিষয়ে আমরা বেশী লিখবনা।  আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই যে, এক প্যাকেট ওরস্যালাইনে যেমন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি সামান্য সচেতনতায় বা জ্ঞান দ্বারা এইডসের মত রোগ থেকে দুরে থাকা যায়। (জীবন মরনের মালীক মহান সৃষ্টিকর্তা, এটা স্বীকার করেই আমরা এটা লিখছি)।

দুর্নীতি আমাদের দেশে মরনব্যাধি ক্যান্সার ও এইডসের রূপ ধারন করেছে। কিন্তু দুর্নীতি কি এটাই আমরা অনেকে জানিনা। ইতিপূর্বে আমরা দুর্নীতির সংজ্ঞা প্রবন্ধে একে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছি।(দ্রস্টব্যঃ- http://corruptionwatchbd.com/1-2/ )। কিন্তু সাধারন মানুষসহ দুর্নীতি দমনের সাথে জড়িত অনেকের ধারনা এরূপ যে, শুধু জেল খাটলেই বা দুর্নীতি দমন কমিশনের(দুদক) তফসিলভুক্ত ধারায় কারও বিরুদ্ধে মামলা হলেই মনে করা হয় যে, শুধু সে লোকই দুর্নীতিবাজ। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি বা জেল খাটেনি, এরূপ লাখ লাখ দুর্নীতিবাজ আছে, তাদেরকে পরিবার, সমাজ, রাস্ট্র মনে করে যে, তারা সৎ।

দুদকের তফসিলভুক্ত ধারা ছাড়াও সমাজে, রাস্ট্রে(সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে) এর(দুদকের তফসিলভুক্ত ধারার) বহু বহু গুন দুর্নীতি প্রকাশ্যে-গোপনে হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত ধারার আওতায় নহে, যেহেতু এগুলোর জন্য কোন ফৌজদারী মামলা হওয়ার সুযোগ নেই, এবং যেহেতু এগুলোর জন্য কাহাকেও জেলে যেতে হবেনা, ৫কোটি, ৫০কোটি, ৫০০(পাঁচ শত)কোটি, ৫০০০(পাঁচ হাজার) কোটি টাকার বা তারও বেশী দুর্নীতির জন্য কাহাকেও জেলে যেতে হয়না বা কোন ফৌজদারী মামলা হওয়ার সুযোগ নেই, তাই এরা সবাই সৎ। অপরদিকে ৫০০(পাঁচ শত) টাকার ঘুষের জন্য জেলে গেলেই দুর্নীতিবাজ।

দুদকের তফসিলভুক্ত ধারায়ও বহু দুর্নীতি আছে বা হচ্ছে যার অতি নগন্য অংশ বিচারের আওতায় আসছে।( আরও দ্রস্টব্যঃ- দুর্নীতি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে-সর্বাত্মক অভিযানে নামুন-http://www.kalerkantho.com/print-edition/editorial/2017/06/16/509432 – দুদক সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমনে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিছু রাঘব বোয়াল দুর্নীতিবাজকেও আইনের আওতায় আনতে পেরেছে। এর পরও দুদকের প্রচেষ্টা ঝিনুক দিয়ে সাগরের পানি সেচের মতো। …..। এক বছরের দুর্নীতি ও তার বিচার- http://corruptionwatchbd.com/20-2/  )।

দুদকের তফসিলভুক্ত ধারা ছাড়াও সমাজে, রাস্ট্রে(সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে) যে দুর্নীতি হচ্ছে তার একটি অত্যন্ত সুন্দর সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর মো. আবু নসর সাহেব। তাঁহার ও দৈনিক আমাদের সময়-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন পূর্বক আমরা এর অংশ বিশেষ সম্মানিত পাঠকের জন্য হুবহু উদধৃত করলাম-

দুর্নীতির কারণ ও তার প্রতিকার- প্রফেসর মো. আবু নসর-http://www.dainikamadershomoy.com/todays-paper/119226/  …….

ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে নিয়মবহির্ভূত সব ধরনের কাজকর্ম, আচারব্যবহার, কথাবার্তা এবং জাগতিক লোভ ক্ষমতার বশবর্তী হয়ে বিত্তবাসনা চরিতার্থ করার জন্য অবৈধ পথে আয়উপার্জন করাকে দুর্নীতি বলে। অসৎ উপায়ে টাকাপয়সা কামানো যেমন- সুদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ফাঁকিবাজি, কালোবাজারিসহ বিভিন্ন প্রকার অবৈধ প্রক্রিয়ায় সম্পদ আহরণই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি বলতে আমরা বুঝি প্রাপ্ত বা অর্জিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করা। অন্য কথায় যাবতীয় অনিয়মই দুর্নীতি। দুর্নীতি ইংরেজি প্রতিশব্দ শব্দটি ল্যাটিন ক্রিয়া শব্দ থেকে এসেছে। শব্দটির অর্থ করা হয়েছে ঘুষ, ভেজাল, কৃত্রিম এবং নকল হিসেবে। উইকিপিডিয়া অনুসারে দর্শন, ধর্মশাস্ত্র অথবা নৈতিকতার আলোকে দুর্নীতি হলো আধ্যাত্মিক নৈতিক অবক্ষয় অথবা অর্থনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। দুর্নীতি হচ্ছে অনার্জিত আয় যা প্রাপ্তিতে আইন বিধিস্বীকৃত রোজগারের পন্থা অনুসৃত হয়নি। সহজ কথায় অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করা, দায়িত্বে অবহেলা করা, নিজ স্বার্থে নীতিভ্রষ্ট হয়ে কাজ করাই হলো দুর্নীতি। অন্যায়ের কাছে নীতির পরাজয়, অর্থের কাছে বিবেকের পরাজয়ই হলো দুর্নীতি। অন্য কথায় নীতির বিপরীত দুর্নীতি। নীতি হলো সত্যের নির্দেশ। আর সত্যের নির্দেশকে অমান্য করা বা তার সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন বিচ্ছেদ করাটাই দুর্নীতি।

দুর্নীতি সন্ত্রাস অপরাধমূলক মানব আচরণ যা জাতীয় বিপর্যয় ধ্বংস ডেকে আনে। দুর্নীতি মানব অধিকার লঙ্ঘন হরণের অন্যতম শক্তিশালী অবলম্বন। প্রতিটি মানুষের ভেতর একটা হিংস্র পশু আছে, যেটা প্রতিনিয়ত আমাদের অন্যায় পাপ কাজে উৎসাহিত করে। সেই হিংস্র পশু বা পাপিষ্ঠ আত্মার ক্রিয়াকর্মই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি তখনই হয়, যখন নিজের আত্মার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, যখন সত্যের ওপর মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, যখন পশুত্ব মনুষ্যত্বকে অতিক্রম করে, যখন প্রয়োজনের তুলনায় চাহিদা বেশি হয়, যখন ক্ষুধা লোভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। অভাব নয়, অতিরিক্ত চাহিদা লোভের কারণেই দুর্নীতি হয়। দুর্নীতি বর্তমানে আমাদের দেশে একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায়, মানুষের চাহিদা এবং অভাব হলো অপরিসীম। মানুষের অতিরিক্ত চাহিদাই সৎ জীবনযাপনের প্রধান অন্তরায়। অভাবই দুর্নীতির একমাত্র কারণ নয়, কেননা নৈতিকভাবে যারা আদর্শবান নির্লোভ তারা অভাব সত্ত্বেও সব সময় দুর্নীতি থেকে দূরে থাকে। বস্তুত দুর্নীতি মানুষের সহজাত কুপ্রবৃত্তিগুলোর অন্যতম। বিশ্বনবী হজরত মুহম্মদ (.) বলেছেন, কোনো আদম সন্তান যদি স্বর্ণরতœরাজি পরিপূর্ণ একটি সম্পূর্ণ উপত্যকা কোনো সময় পেয়ে যায়, তাহলে সে দ্বিতীয় উপত্যকাটি চাইবে। মাটি ছাড়া কোনো কিছুই তার মুখ বন্ধ করবে না। মানুষ এক প্রকার প্রাণী যা জন্মগ্রহণ করে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে। সবকিছুই তার চাই। একটা পূরণ হলে আর একটা চাই। এভাবেই চলে মানুষের চাহিদা, ক্ষুধা লোভের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। প্রত্যেকে যেহেতু বিত্তবাসনার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে দুর্নীতি। ফ্রাঙ্কবুকম্যান বলেছেন, পৃথিবীতে সবার প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে কিন্তু সবার লোভ মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অপেক্ষা অতিরিক্ত জাগতিক উচ্চাভিলাষ লোভলালসা দুর্নীতির কারণ। দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ নৈতিক অবক্ষয় ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার অভাব। দুর্নীতির অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতা স্বচ্ছতার অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, সর্বোপরি সরকার পরিচালনা উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের সঠিক, কার্যকরী গঠনমূলক অংশগ্রহণের অভাব। দুর্নীতিবাজরা সমাজের দেশের বিত্তশালী রাক্ষস। অর্থসম্পদের ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত লোভ এবং মোহ মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। মানুষের সম্পদের প্রতি মোহ প্রকৃতিগত। সম্পদের প্রতি মোহ এমন যে, এর কোনো সীমাপরিসীমা নেই। দুর্নীতি আকাশ ছুঁয়েছে, আর সন্ত্রাস আমাদের নামিয়েছে অতল গহিনে। দুর্নীতি মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে তুলেছে। ………

তাই শুধু দুদকের তফসিলভুক্ত ধারার দুর্নীতিই একমাত্র দুর্নীতি নহে। শুধু জেল খাটালেই দুর্নীতি দমন হবেনা। জেল জরিমানা ছাড়াও দুর্নীতি দমনের বহু পন্থা আছে। অতএব দুর্নীতি দমনের জন্য “দুর্নীতি কি এবং এর দমনের আরও কি পন্থা” আছে তা জানা দরকার। ৫-১০-২০বছরব্যাপী দুর্নীতির মামলা চালিয়ে, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, উকিল, মুহুরী, বিচারক, কোর্ট স্টাফসহ আরও হাজার হাজার লোককে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে, বছরে কয়েক কোটি সংখ্যক দুর্নীতির ঘটনা সৃষ্টি করে দুর্নীতি দমন হবেনা।

সরকারী কর্মচারীদের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রনীত আচরন ও শৃংখলা বিধিতে এমন ধারাও আছে যে, অননুমোদিত অনুপস্থিতির জন্য চাকুরীচ্যুতি। কিন্তু নিম্ন আদালতের বিচারকদের অনেকেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর প্রকাশ্যে এজলাস ফাঁকি দিচ্ছেন ও ডাক্তাররা প্রকাশ্যে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকছেন, যা চাকুরীচ্যুতির(পেনশন বেনিফিট ছাড়াই) মত অপরাধ। তা কি আমরা জানি বা সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধিরা জানেন? আমাদের মাননীয় জনপ্রতিনিধিরা কি এব্যাপারে কখনও সোচ্চার হয়েছেন। এগুলোতো তাঁদের সামনেই ঘটছে। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতের সংসদ সদস্যরা এব্যাপারে সোচ্চার।

দুর্নীতি এইডস ও ক্যান্সারের রূপ ধারন করেছে। এটা মহামারী আকারে দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে বাঁচতে হলে এর স্বরূপ জানতে হবে ও প্রতিরোধের পন্থা জানতে হবে। আমরা পূর্ববর্তী কয়েকটি প্রবন্ধে কিছু আলোকপাত করেছি। যেমনঃ- ২-৩জনে ২০-৩০জনের ঘুষ যোগায়।- http://corruptionwatchbd.com/53-2/ , আইন-(Law)- http://corruptionwatchbd.com/44-2/ , ইত্যাদি।

Related posts