ক্ষমতায় থাকতে/যেতে হলে, জানতে হবে-৩। বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পের নীট মুনাফা।

 

ঢাকা শহরের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিনে  ডেমরা  থেকে উত্তরে তুরাগ নদী, পশ্চিমে বিশ্বরোড(প্রগতি সরনি), পূর্বে অবারিত বিস্তৃত এলাকায় অবস্থিত বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন, ক্রয় বিক্রয় ইত্যাদি নিয়ে গবেষনা/স্টাডি করে দেখা যায় যে, হাউজিং কোম্পানীগুলো ১৯৮৭সাল থেকে অদ্যাবধি(২০১৮ইং) কোন জমিই গড়ে প্রতি কাঠা ১(এক)লাখ টাকার বেশী দামে কিনে নাই।(যদিও প্রকৃত পক্ষে সকল অনিয়মই ভয়ানক আকারে করেছে এবং সকল জমিই গড়ে প্রতি কাঠা ১(এক)লাখ টাকার অনেক কম দামে কিনেছে। ১৯৮৭সালে  অত্র এলাকার জমি প্রতিবিঘা(২০কাঠা) ছিল ৫০হাজার থেকে ১লক্ষ টাকা, ১৯৯০-৯৫তে প্রতিবিঘা ২-৩লাখ, ১৯৯৫-২০০০এ ৩-৪লাখ, ২০০০-২০০৫-২০১০এ ৫-৭লাখ টাকা )। এটা আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, রেজিস্ট্রি দলিল, তৎকালীন ও বর্তমান জমির মালীক, আশেপাশের জমির মালীক, একাধিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট  ও ভূক্তভোগীদের বক্তব্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য। অল্প কিছু জমি কিনে বেশীরভাগ সময়ে নানা কৌশল, অপকৌশল, কুট কৌশল, ট্র্যাপ সৃষ্টি করে, পকেট সৃষ্টি করে, ছিঁচকে চোর, মাস্তান, ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যানকে হাত করে অতি অল্পমূল্যে চারিপাশের  জমির মালীক ও ভূক্তভোগীদেরকে জমি বিক্রী অথবা বিনিময় করতে বাধ্য করা হয়। যারা জমি বিক্রীতে বাধ্য হয়নি অথবা  হাউজিং কোম্পানীগুলোকে ৭৫%, নিজের ২৫%- এই নিয়মে বিনিময়ে(exchange) রাজী হয়নি, তাদের জমি সরাসরি ভরাট/দখল করে ফেলা হয়।  অনোন্যপায় হয়ে অনেক জমির মলীক কোম্পানীগুলোকে ৭৫%, নিজের ২৫%- এই নিয়মে বিনিময়ে(exchange) করে, যাতে  কোম্পানীগুলোর আরও অনেক বেশী লাভ হয়। কখনও কখনও জমি না কিনেই, বিনিময় করা ছাড়াই আগাম ভরাট করে ফেলে।

ব্যক্তি মালীকানা ব্যতীত, খাস/অর্পিত বহু সম্পত্তি আছে, যেগুলো অধিগ্রহন ব্যতীত দখল/ভরাট করে ফেলা হয়। জানামতে সরকারী এসব জমির কোন প্রকার মূল্য অদ্যাবধি(২০১৮ইং) পরিশোধ করা হয়নি। সরকারী এসব জমি ভরাট/দখল করতে না পারলে হাউজিং কোম্পানীগুলো তাদের আবাসিক প্রকল্পগুলোকে regular/uniformed shape দিতে পারতনা।

১। গবেষনা/স্টাডি থেকে দেখা যায় যে, পূর্বাঞ্চলের(বিশেষ করে দক্ষিনে  ডেমরা  থেকে উত্তরে তুরাগ নদী, পশ্চিমে বিশ্বরোড(প্রগতি সরনি), পূর্বে অবারিত বিস্তৃত এলাকায় অবস্থিত) বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পের জমিগুলোর ক্রয় মূল্য(১৯৮৭সাল থেকে অদ্যাবধি ২০১৮ইং)  গড়ে প্রতি কাঠা ১(এক)লাখ টাকার বেশী পড়ে নাই।

২। হিসাবের সুবিধার্থে কোন আবাসিক প্রকল্পে যদি আমরা ১০০(একশত) একর বা ৬,০০০ কাঠা ভূমি ধরি(কোন কোন বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পে ৫০০০একর=৩,০০,০০০কাঠা ভূমি আছে),তাহা ক্রয়ে সর্বোচ্চ ৬০০০কাঠাxপ্রতি কাঠা ১লক্ষ টাকা=৬০কোটি টাকা।

৩। এই ভূমি যদি গড়ে ১০ফুট গভীর ধরি, তাহলে তা ভরাটে ৬,০০০ কাঠাxপ্রতি কাঠা ৭২০বর্গফুটx ১০ফুট গভীর=৪,৩২,০০,০০০ঘনফুট মাটির প্রয়োজন। ২০১৮সালের সর্বশেষ দর মোতাবেক মেঘনা/বালু নদী থেকে ড্রেজার পাইপে স্পটে পৌঁছিয়ে বালি/মাটি ভরাটের বেসরকারী দর গড়ে ৪(চার)টাকা প্রতি ঘনফুট এবং RAJUK/PWD-এর দর ৩টাকা প্রতি ঘনফুট । তার মানে ১৯৮৭সালে দর আরও অনেক কম ছিল। তথাপি আমরা যদি বালি/মাটির দর ১৯৮৭ইং থেকে-২০১৮ইং গড়ে ৩(তিন)টাকাও ধরি তাহলে রাস্তাঘাটসহ প্লটের যায়গা ভরাট করতে ৪,৩২,০০,০০০ঘনফুটx৩টাকা=প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

৪। ১০০একরের ১০% ভূমি রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাথ ধরলে =১০ একর=প্রায় ৪,৩২,০০০ বর্গফুটXপ্রতি বর্গফুট ৫০০টাকা=প্রায় ২২কোটি  টাকা সিসি কার্পেটিংয়ের রাস্তা,  ড্রেন ও ফুটপাথ  নির্মান ব্যয়। (R&H, LGED – এর দর তালীকা মোতাবেক। বেসরকারী দর আরও কম)।

৫। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ইত্যাদিঃ- গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, Waste Water Disposal, রেজিস্ট্রী খরচ, নিরাপত্তা চার্জ, সার্ভিস চার্জ, ইত্যাদির জন্য প্লটের মালীকদের কাছ থেকে প্রকৃত প্রয়োজনের ৪-৫গুন বেশী টাকা নেওয়া হয়েছে।গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির লাইন এখনও ২০%ও করা হয়নি, Waste Water Disposal মোটেও করা হয়নি।

৬। এস্টাবলিসমেন্ট কস্ট(অফিস, অফিসের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, যানবাহন, ইত্যাদি) সর্বোচ্চ ১০কোটি টাকা।

৭। ১০০একরে মোট ব্যয় প্রায় ১১০কোটি টাকা। গড়ে প্রতি কাঠার সার্বিক ক্রয় মূল্য=২(দুই) লক্ষ টাকারও কম।

৮। ৩০% ইউটিলিটি বাদ দিলে মোট বিক্রয়যোগ্য ভূমির পরিমান=৪,২০০কাঠা।

৯। ২০০০সাল থেকে ২০১৮সাল অবধি অত্র এলাকার বেসরকারী হাউজিং কোম্পানীগুলোর প্রিন্টেড মূল্য তালীকা, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল্য তালীকা, যে প্লটগুলো রাজউকের অনুমোদন ও ভরাটের পূর্বেই বিক্রী হয়ে গেছে, যেগুলোতে ১.৫০কোটি টাকা দরে পরযন্ত কাঠা বিক্রী হয়েছে, এরূপ দর মোতাবেক উল্লেখিত এলাকার আবাসিক প্রকল্পের জমির ১৯৮৭সাল থেকে ২০১৮সাল অবধি প্রতি কাঠার গড় বিক্রয় মূল্য প্রায় ৬০লক্ষ টাকা। (যদিও বাস্তবে আবাসিক প্রকল্পের জমিগুলো আরও অনেক বেশী দামে বিক্রী হচ্ছে)। ক্রেতার কালো টাকা hide করা, ক্রেতা-বিক্রেতার আয়কর ও রেজিস্ট্রেসন ফিস ফাঁকি দেয়ার লক্ষ্যে, বেনিফিসিয়ারীরা সকল ক্ষেত্রেই জমির মূল্য কম দেখিয়েছে।

১০। তথাপি আমরা প্রতি কাঠা গড় ৫০লক্ষ টাকা হিসাবে ধরি এবং ৪২০০কাঠার বিক্রয় মূল্য=২১০০কোটি টাকা। রাজউক ও সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত, সরকারী খাস, অর্পিত, পরিত্যক্ত, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের(ভাওয়াল রাজার জমি) ভূমি বেসরকারী হাউজিং কোম্পানীগুলো অবৈধভাবে ভরাট করায় ১লাখ-২লাখ টাকারও  কম মূল্যের ভূমির মূল্য ৫০লাখ থেকে ১-দেড় কোটি টাকা মূল্য হয়ে যায়। কোন কোন বেসরকারী হাউজিং কোম্পানী গত শতকের আশির দশকের রাজউকের  কয়েক একরের অনুমোদন দেখিয়ে ক্রেতাদেরকে প্রলুব্ধ করে কয়েক হাজার একর বিক্রি করে ফেলে।

১১। ব্যয় বাদে ১০০একরের আবাসিক প্রকল্পে নীট মুনাফা প্রায় ২০০০কোটি টাকা।  প্রায় ১৬০০%(১৬গুন)।

১২। উপরোক্ত এলাকার একটি বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পে মোট জমির পরিমান প্রায় ৫০০০একর এবং তাদের নীট মুনাফা ন্যুনতম ১,০০,০০০(এক লাখ) কোটি টাকা। অপর একটি বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পে মোট জমির পরিমান প্রায় ৩০০০একর এবং তাদের নীট মুনাফা  ন্যুনতম ৫০,০০০ কোটি টাকা।

১৩। অনেক বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পে ৩০% ইউটিলিটি, নাগরিক সুযোগ সুবিধা-এর স্থলে রাস্তাসহ ১৫% ভূমিও খালি/সংরক্ষিত রাখেনি। এরা মসজিদ মাদ্রাসার জমিও বিক্রী করে ফেলেছে। উত্তরা, পূর্বাচল, আর্মির জলসিঁড়ি, ইত্যাদি আবাসিক প্রকল্পে ৪৫%-৫০% ভূমি ইউটিলিটি, নাগরিক সুযোগ সুবিধা -এর জন্য  খালি/সংরক্ষিত রাখা হয়। বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পগুলোতেও অনুরূপ পরিমান(৪৫%-৫০% ভূমি) ইউটিলিটি-এর জন্য খালি/সংরক্ষিত রেখে অবশিষ্ট জমি বিক্রয় করলে উপরোল্লিখিত পরিমানের সমান বা তার চেয়েও বেশী পরিমান টাকা নীট মুনাফা(Net profit) করা সম্ভব ছিল। কিন্ত বহু অবৈধ Land developer চর দখলের মত অসম/অশুভ প্রতিযোগিতায় নেমে হাওর বিল জলাভূমি বন্যাপ্রবাহ এলাকা অপরিকল্পিত উপায়ে ভরাট করে, ভরাট না করে বিক্রী করে ফেলে। যদি পরিকল্পিতভাবে এটা করত তাহলে নীট মুনাফা এবং ইউটিলিটিসহ হাওর বিল জলাভূমি বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষিত বা অক্ষুন্ন থাকত। ঢাকায় একটি প্লট/ফ্ল্যাট থাকার ইচ্ছা, বিভিন্ন সময়ে শেয়ার বাজারের উল্লম্পন এবং সীমাহীন দুর্নীতির কালো টাকায় বেসরকারী হাউজিং কোম্পানীগুলোকে এ অপকর্মে উৎসাহিত করে। উপরন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরগুলোর ও রাজনীতিবিদদের লাগামহীন দুর্নীতি ও দায়িত্বে-কর্তব্যে অবহেলাও সর্বোচ্চ দায়ী।

(প্রিয় পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি না ঘটাতে সংক্ষেপে আমরা উপরের বর্ননা প্রকাশ করলাম)।

See more:-   https://www.facebook.com/corruptionwatchbd16/

Related posts