কোকিল ছানা, ঘুষখোর এবং …

কাকের বাসায় কোকিল ছানার বড় হওয়ার পর বুঝা যায় তা কাকের ছানা নহে, কোকিল ছানা। ঘটনা যাহাই হোকনা কেন, একসময় তা প্রকাশ হয়। তবে কোকিল ছানা কাকের বা কোকিলের অবৈধ সন্তান নহে। তবে আমাদের সমাজে লাখ লাখ কোটি কোটি অবৈধ সন্তান আছে, যাদেরকে চেনা যায়না। তবে তাদেরকেও চেনা যায়, কিন্তু আমরা বলিনা। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে তাদেরকে চেনা যায়।

ঢাকা মেডিক্যালের দুজন পুরুষ-মহিলা ডাক্তার গভীর রাত্রে মহিলা ডাক্তারের বাসায় তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে রাত্রি যাপনকালে আশেপাশের লোকজনের হাতে আটক হন। যদিও সিংহভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রকাশ হয়না। যেহেতু মহিলা ডাক্তার বিবাহিতা এবং স্বামী জীবিত, তাই অন্য পুরুষ কর্তৃক গর্ভধারনে তার কোন রিস্ক নাই। এই অবৈধ গর্ভধারনজাত সন্তান নিয়ে কেহ সন্দেহ করবেনা। এই অবৈধ সন্তানটি আভিজাত্যের মধ্যেই বেড়ে উঠবে এবং সেও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, বিচারক, মন্ত্রী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ইত্যাদি হবে।

এধরনের অবৈধ সন্তানকে চিনবেন আচার-আচরন দ্বারা, যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে, অবৈধ উপায়ে ব্যবসা করে, অবৈধ উপায়ে রাজনীতি করে এবং এরূপ আরও অনেক উপায়ে।

চানক্যের আমল(খ্রীস্টপূর্ব৩৫০-২৭৫) থেকেই ঘুষ দুর্নীতির কথা জানা যায়। রাজা বাদশাহ ব্রিটিশ পাকিস্তান আমল থেকে জমির খাজনা কাজীর বিচারালয়ের কর্মচারী কোর্টের পেশকার সেরেস্তাদারদের দুর্নীতির কথা ইতিহাসে বহু লেখা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ আমলে কয়েকটি বিশেষ ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা নিজেরাই বলেছেন যে, তাদের ডিপার্টমেন্টে ঠিকাদারী বিলে পার্সেন্টেজের একটি প্যাকেজ নির্দিস্ট থাকে। কারও পক্ষে এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। যদি কোন কর্মকর্তা পার্সেন্টেজ না নেন তথাপিও তাকে বিলে স্বাক্ষর করতে হবে। পার্সেন্টেজ প্যাকেজের একথাটি কতটুকু সত্য তা তারা বলতে পারবেন, তবে একথা তারা আমাকে বলেছেন নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে, একথা শতভাগ সত্য।

সেবামূলক সরকারী কাজে ৫-১০-২০জনের বা ৫-১০-১৫জনের একাধিক স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। এসব স্বাক্ষর করতে সরেজমিনে বহু তদন্ত করতে হয়, অনুলিপির/ ফটোকপির মূল দলিলের যথার্থতা যাচাই করা ইত্যাদি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এসব এড়ানোর জন্য অনেক সেবাপ্রার্থী স্বেচ্ছায় স্পীডমানিরূপ কিছু অর্থ দপ্তরের কোন এক ব্যক্তির মাধ্যমে দেয়। এ স্পীড মানিরূপ ঘুষ ভাগ হয়ে ৫-১০-১৫জনের কাছে যায়। এ ৫-১০-১৫জনের এক বা একাধিক ব্যক্তি সৎ হতে পারেন, যারা স্পীড মানিরূপ ঘুষ নেননা, তবে উপরের নীচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষর সুপারিশের আলোকে তারা ফাইল ছেড়ে দেন। আবার ৫-১০-১৫জনের এক বা একাধিক ব্যক্তি আছেন, যারা সম্পূর্ন সৎ নহেন, তবে তারা অন্যদের ধারাবাহিকতায় স্পীড মানির অংশ নেন বা পান। তবে তারা উপরের নীচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষর সুপারিশের আলোকে ফাইল ছেড়ে দেন, স্পীড মানিরূপ ঘুষের জন্য ফাইল আটকে রাখেন না।

স্পীড মানিরূপ ঘুষ যেহেতু আমাদের দেশে মালয়েশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার কোন কোন দেশের মত বৈধ নহে, তথাপিও ইহা কয়েকহাজার বছর পূর্বের চানক্যের আমল থেকেই চলে আসছে। স্পীড মানিরূপ ঘুষ সহনীয় হয়ে গেছে, এবং এর একটি অলিখিত রেট বা পার্সেন্টেজ সারাদেশের সব ডিপার্টমেন্টের সকল অফিসে নির্ধারিত আছে। তথাপিও স্পীড মানিরূপ ঘুষ দিতেই হবে বা পেতেই হবে এমন কোন কথা নেই। স্পীড মানিরূপ ঘুষতো বটেই, এর বাইরেও নির্দিস্ট রেটের বহুগুন অর্থ কোন কোন কর্মকর্তা দাবী করে। যেমন ১৯৫৬সাল, ১৯৬০-৬৫সাল থেকে অদ্যাবধি যেসকল জমি রেজিস্ট্রি দলিলমূলে তৎকালীন পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশের মুসলমানদের নামে, দখলে ছিল এবং আছে, এবং মাঝখানে কখনও কোন হিন্দুর নামে রেজিস্ট্রি ও দখলে ছিলনা, তথাপিও সেসকল জমি শুধুমাত্র ঘুষের জন্য অর্পিত সম্পত্তির(vested property-vp) তালীকায় তোলা হয় এবং ভূমি মন্ত্রনালয় কর্তৃক সুষ্পস্ট সার্কুলার-নির্দেশ দেওয়া সত্বেও এসকল ১০০% নিষ্কন্টক জমি অবমুক্ত বা মিউটেশন করতে ঢাকা, চট্টগ্রামের মত শহরগুলোতে কাঠাপ্রতি সর্বনিম্ন ২০হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত দাবী করা হয় এবং হাজার হাজার জমির মালীক টাকার জন্য বিক্রী বা নিজে বাড়ী করা বা ডেভেলপারকে দিয়ে করানোর স্বার্থে বহুলাখ টাকা ঘুষ দিয়ে মিউটেসন করায়।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা স্পীড মানিরূপ ঘুষের প্যাকেজের বিরুদ্ধে যাওয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব নহে। কেননা এতে প্রকৃত দুর্নীতিবাজরা ক্ষেপে যাবে বা বিগড়ে যাবে। এতে অন্যদেরকে(যারা স্পীড মানিরূপ ঘুষের প্যাকেজের বিরুদ্ধে যাবে) ফাঁসিয়ে দিবে বা বিপদে ফেলবে। যেমন এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান অত্যন্ত করিৎকর্মা হওয়ার কারনে ঘুষদাতা গ্রহীতাদের অনেকের অবৈধ স্বার্থ হানি হচ্ছে। ফলে তাঁকে বেকায়দায় ফেলার জন্য ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করে রাজস্ব আদায় কমিয়েই দেয়নি, তাঁহার ভাল কাজকেও খারাপভাবে উপস্থাপন করে জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ ছাপানো হচ্ছে। এজন্য অনেক সৎ উর্ধতন কর্মকর্তা জেনে শুনেই স্পীড মানিরূপ ঘুষের প্যাকেজ বন্ধ করার চেষ্টা করেননি, কেননা এতে হীতে বিপরীত হবে, সেবাপ্রার্থীর ভোগান্তি বহুগুন বেড়ে যাবে। উপরন্তু উন্নত বিশ্বে এটা বৈধ।

১০০% বৈধ হওয়া সত্বেও প্রচলিত রেটের বহুগুন ঘুষ খাওয়া এসকল ঘুষখোর মেধাবী গৃহকর্তার(আশির দশকের ডঃ ইকবাল ও কাজের বেটী সালেহার, মনির-খুকু, অতি সম্প্রতি ২ডাক্তার) সাথে কাজের মেয়ের, মেধাবী গৃহকর্ত্রীর সাথে ড্রাইভার-পিয়ন-কাজের ছেলের অবৈধ সম্পর্কের ফলে, পতিতা-রক্ষিতা-বাঈজির গর্ভে জন্ম হয়। কিন্তু সমাজে এরা এমনভাবে মিশে যায় যে, কোকিল ছানা চেনা গেলেও এদেরকে চেনা যায়না।

Related posts