বঙ্গবনধুর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব এবং বাকশাল

বিএনপিসহ অনেকেই সমালোচনার সূরে বলে যে, শেখ মুজিবতো স্বাধীনতা চাননি, পাকিস্তানের(পূর্ব ও পশ্চিম) প্রধান মন্ত্রীত্ব চেয়েছিলেন। বাকশাল গঠন নিয়েও অনেকে সমালোচনা করে। কিন্তু বঙ্গবনধুর পাকিস্তানের(পূর্ব ও পশ্চিম) প্রধান মন্ত্রী হওয়া ও বাকশাল গঠনের পক্ষে যে অনেক অনেক বেশী যুক্তি ও বাস্তবতা আছে বা ছিল তা আওয়ামী লীগের কাউকেই বলতে শুনিনি। বরং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই এদুটি প্রসঙ্গে বিব্রতবোধ করতে দেখেছি।

১৯৭০এ আওয়ামীগের নির্বাচনী manifesto-তে পূর্বপাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সরাসরি কোন বিষয় ছিলনা। নিরংকুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বা ১০০%আসন পেলেও সংসদ অধিবেশন বা সরকার গঠন ছাড়া আইনগতভাবে আর কিছুই করার ছিলনা। সংসদ অধিবেশন বসিয়ে বা সরকার গঠন না করে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া মানেই রাষ্ট্রদ্রোহী জাতীয় বেআইনীকাজ হত। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস অন্যরকম হয়ে যেত। এমনকি হয়তো তা আর হইতইনা। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য প্রয়াত আবুল মনসুর আহমদও পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে কোথায় যেন পড়েছি।

সমগ্র পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী হয়েইত পাকিস্তানীরা আমাদের পরাধীন করেছে। আমরা তথা বাঙ্গালী শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানীদেরকে পরাধীন করতে পারবনা কেন? পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের অধীনে থেকে তাদেরকে পরাধীন করা সহজ ছিলনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হলে রাস্ট্রযন্ত্রের বিরাট অংশ বঙ্গবনধু শেখ মুজিবুর রহমান তথা বাঙ্গালীদের অধীনে চলে আসত। বাঙ্গালীদের অধীনে চলে আসার পরও বাঙ্গালী প্রধানমন্ত্রীকে sack করতে পারত। Sack করলেও ইতিমধ্যে রাস্ট্রযন্ত্রের অনেক কিছু আয়ত্বে এনে স্বাধীনতার ঘোষনা দেওয়া যেমন আইনসঙ্গত ছিল তেমনি রাস্ট্রযন্ত্র থেকে সঞ্চিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধে কাজে লাগানো যেত। পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে পাকিস্তানীরা ২৫শে মার্চ ও তৎপরবর্তী অতর্কিতে যে massacre করেছে, তা অনেকটা কমানো যেত। উপরন্তু শেখ মুজিবুর রহমান “প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন” এধরনের কথা utterly rubbish. জুলফিকার আলী ভূট্টোর সাথে ইয়াহিয়ার বাড়াবাড়ি না হলে শেখ মুজিবুর রহমান অথবা দলের কেহ প্রধানমন্ত্রী হতেন, এটাইতো স্বাভাবিক। অন্তত: জিয়াউর রহমান হতেননা। নির্বাচনের পর ৩(তিন)মাসের বেশী সময় যখন ভূট্টো, ইয়াহিয়া বাড়াবাড়ি করছিলো সেসময় জিয়া স্বাধীনতার ঘোষনা দিলেন না কেন? তখন তিনি(জিয়া) কোথায় ছিলেন।

সীমিত গনতন্ত্রে লী কুয়ানের সিঙ্গাপুর আজ কোথায়? সীমাহীন লুটপাট, অর্থপাচার ঠেকাতেই বঙ্গবনধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠন করেছিলেন। বাকশাল কোন অবস্থাতেই কট্টর চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির মত ছিলনা। ইহা সত্য যে, গাজী গোলাম মোস্তফা ও তার ছেলের বাড়াবাড়ি, বঙ্গবনধু কিছু নিকটাত্মীয়ের বাড়াবাড়ি, তাজুদ্দীন সাহেবের সাথে মতবিরোধ-মতভেদ, ইত্যাদি তাঁহার(বঙ্গবনধুর) ইমেজকে অনেক খাটো করেছে। সিরাজ সিকদারের বিরুদ্ধে একটি উক্তি তাঁহার(বঙ্গবনধুর)   ইমেজকে খাটো করেছে, সেজন্য সে(সিরাজ সিকদার) হিরো বনে গেছে। সিরাজ সিকদারের কার্য্যকলাপ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রাস্ট্রের অনুকুলে ছিলনা। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে জিয়া বিতর্কিত হয়েছেন, তাহের হিরো বনে গেছেন। কিন্তু ইহাত সত্য যে, জিয়ার আমলের সিংহভাগ ক্যু’-এর সংগঠক ছিলেন তাহের বা তার দলের লোকেরা। তাহের বা তার দলের লোকেরা এটা করেছিলেন রাস্ট্রীয় ক্ষমতার লোভে। রাস্ট্রীয় ক্ষমতার লোভে তাহের যা করেছেন(ক্যু-এর মাধ্যমে নিরীহ অফিসারদেরকে হত্যা), রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে এবং তা অটুট রাখতে জিয়া তাই করেছেন(বিচারের নামে ক্যু’কারীদেরকে হত্যা করেছেন)। সেই বড় টুকরা ছোট টুকরা খাওয়ার মত।

রাস্ট্রযন্ত্রের সাথে তূলনা করলে নিন্দুকদের বঙ্গবনধু শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বোক্ত ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়েনা। বাকশাল গঠন দেশের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর সঠিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। বঙ্গবন্ধুকে যেমন চাটারদল(চাটুকারের দল) মিসগাইড করেছিল, তাঁহার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে একই কায়দায় চাটারদল (চাটুকারের দল) মিসগাইড করছেনা? অবশ্যই করছে। যদি না করত তাহলে গত ৭(সাত)বছরে বর্তমানের চেয়ে আরও অনেক বেশী উন্নতি করা সম্ভব ছিল।

Related posts