কে ”কতগুন” বেশী মেধাবী, কে ”কতগুন” বেশী সৎ/অসৎ, কার কাজ ”কতগুন”  বেশী কঠিন, ……।

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক, সচিব, পুলিশ, দুদক, শিক্ষক, কৃষিবিদ, ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিগন কে কার চাইতে বেশী মেধাবী, কে কত বেশী সৎ/অসৎ, কার কাজ কত বেশী কঠিন/সহজ, ইত্যাদি তূলনা করা বা পরিমাপ করার সুনির্দিস্ট কোন স্কেল, মিটারিং ইন্সট্রুমেন্ট, ইত্যাদি নেই। কোন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন না, ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তারী পড়েন না। এভাবে সাধারনতঃ এক পেশার ব্যক্তিগন অন্য পেশার লেখাপড়া করেননা। যার ফলে কোন বিষয়ের বা কোন পেশার লেখাপড়া অন্য পেশার লেখাপড়ার চাইতে বেশী কঠিন/সহজ, ইত্যাদি পরিমাপ করা সহজ নহে। তবে অনুমান করা যায়। যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার  কৃষিবিদদের অনেকেই নিজস্ব বিষয়ে এমএস, পিএইচডি করার বাইরেও বিবিএ/এমবিএ, এলএলবি/এলএলএম ইত্যাদি বিষয়ে ডিগ্রী নেন। পত্রিকার খবরে জানা যায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে কয়েকটি ডিগ্রী ছাড়াও এমবিএ, ইত্যাদি ননটেকনিক্যাল একাধিক ডিগ্রীধারী।

গণিতকে(Mathematics) ভয় পায়না এমন ছাত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অনেক সাবজেক্টের মধ্যে প্রথম বর্ষে যে গণিত পড়ানো হয়, গণিতের অধ্যাপকের ভাষ্যমতে, তা নাকি গণিতে অনার্স বিষয়ের সবচেয়ে কঠিন অংশটুকু। অপরদিকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অপর সাজেক্টগুলো গণিতের চেয়ে অনেক অনেক বেশী কঠিন। এমতাবস্থায় একজন ইঞ্জিনিয়ার অনুমান করতে পারবে ননটেকনিক্যাল অন্য বিষয়গুলো কত সহজ বা কঠিন। কিন্তু ননটেকনিক্যাল(গনিত বা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয় ব্যতীত) বিষয়ে পড়ুয়ারা, তাঁরা যত মেধাবীই হোননা কেন, কখনও অনুমান করতে পারবেননা যে, গনিত বা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলো কত সহজ বা কঠিন। ননটেকনিক্যাল বিষয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে টেকনিক্যাল বিষয়ে পড়ুয়াদের চাইতেও মেধাবী আছেন বা থাকতে পারেন।

বাস্তবজীবনে, কাজের ক্ষেত্রেও কার কাজে কত মেধার প্রয়োজন তা অনুমান করা কঠিন।   ডাক্তারদের মধ্যে ফিজিসিয়ানদের যে মেধার প্রয়োজন সার্জনদের প্রয়োজন আরও অনেক বেশী। ইলেকট্রিক্যাল/ইলেকট্রনিক, মেকানিক্যাল, কেমিক্যাল, সিভিল, ইত্যাদি ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যেও একেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মেধা, কাজের রিস্ক, শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের ধরনে আকাশ পাতাল ব্যবধান।

একই বেতন স্কেলে বিদ্যুৎ বিতরন/উৎপাদন/সঞ্চালন, কলে কারখানায় কর্মরত একজন সহকারী প্রকৌশলীর যে প্রয়োজনীয় মেধা, কাজের রিস্ক, শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের ধরনে অফিসে বসে কর্মরত সহকারী পরিচালক, সহকারী সচিব, সহকারী কমিশনারের, প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মেধা, কাজের রিস্ক, শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের ধরনে আকাশ পাতাল ব্যবধান। অনুরূপভাবে সমান্তরাল উর্ধতন পদগুলোর ক্ষেত্রেও সমান যুক্তি প্রযোজ্য।

সততা/অসততার ক্ষেত্রেও একটি প্রচলিত ধারণা যে, অমুক বা অমুক পেশার লোকেরা বেশী সৎ বা বেশী অসৎ। এটা সম্পূর্ন relative matter. ১কোটি টাকার ফাইলে একজন কর্মকর্তা ১লাখ টাকা ঘুষ নিল, ১লাখ টাকার বিনিময়ে খুনের আসামীকে অব্যাহতি দিল, ১লাখ টাকা না পেয়ে নির্দোষ লোককে জেলে দিল। এখানে কার চাইতে কে বেশী দুর্নীতিবাজ? এমনও বাস্তব প্রমান আছে যে, ৮লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় নিম্ন আদালতের জেলাজজকে ১০লাখ টাকা না দেওয়ায় ৮বছর মামলা বিলম্বিত করে ২প্রকৌশলীকে শাস্তি দেয়। এখানে কে বেশী দুর্নীতিবাজ-প্রকৌশলী না জেলাজজ? (আমাদের বিবেচনায় জেলাজজ প্রকৌশলীদের চেয়ে অনেক অনেক বেশী দুর্নীতিবাজ)।

গ্রাহকের বিদ্যুতের চাহিদা অনুমোদনের জন্য ফাইল অতিরিক্ত সচিবের কাছে গেলে, বোর্ডের সদস্যকে অতিরিক্ত সচিব প্রশ্ন করেন “মেগাওয়াট কি?” সর্বনিম্ন পর্যায়(উপসহকারী/সহকারী প্রকৌশলী) কর্তৃক আরম্ভ করা প্রস্তাবের পর ৮-১০জন প্রকৌশলীর সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব/সচিব সর্বশেষ স্বাক্ষর করবেন। তাদের(অতিরিক্ত সচিব/সচিব) স্বাক্ষর হবে ”অনুমোদিত” অথবা “”অনুমোদিত নহে” বলে। সাধারনতঃ তারা স্বাক্ষর করেন ”অনুমোদিত” বলে।  তারা(অতিরিক্ত সচিব/সচিব) যদি ”অনুমোদিত নহে” বলে প্রস্তাব নাকচ করেন, তাহলে কি বলে নাকচ করবেন? কারিগরী কোন ত্রুটী উল্লেখ করেই তাদেরকে প্রস্তাব নাকচ করতে হবে। যেখানে তারা মেগাওয়াট কি ইহাই জানেন না, সেখানে লাখ লাখ যন্ত্রপাতি সম্বলিত একটি স্থাপনার কারিগরী কি ত্রুটি বের করে প্রস্তাব নাকচ করবেন? উল্লেখ্য যে, মেগাওয়াট হচ্ছে বিদ্যুতের একক। 10,00,000watts=1megawatt. এখানে কাজ করতে কার বেশী মেধার প্রয়োজন- উপসহকারী/সহকারী প্রকৌশলীর না অতিরিক্ত সচিব/সচিবের?

পুলিশ, র‌্যাবসহ সকল প্রকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যেমন বিজিবি, নারকোটিকস, আয়করের গোয়েন্দা, দুদক, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদেরকে বহু মেধা, শারীরিক/মানসিক পরিশ্রমের পর কয়েক বর্গকিলোমিটার/কয়েক শত বা হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা, এমনকি সারাদেশ চষে বেড়িয়ে, বহু কৌশল প্রয়োগ করে, অতি ক্ষুদ্র ক্লু(clue)-এর সাহায্যে অনেক বড় অপরাধীকে চিহ্নিত করে আদালতে সোপর্দ করে। আদালত সিংহভাগ ক্ষেত্রে শুধু তার সামনে উপস্থাপিত একটি ফাইলে রক্ষিত ডকুমেন্ট ও একাধিক উকিলের সহায়তায় একটি কক্ষে বসে বিচার কাজ করেন। ধর্ম, রাস্ট্র এমনকি বাস্তবিক নৈতিকতার বিচারে সকল স্তরের বিচারক অবশ্যই উচ্চ মর্যাদাবান। কিন্তু তাঁদের বিচারকাজ উপরোল্লিখিত আইন শৃংখলা-রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তূলনায় বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিগনের তূলনায় অনেক অনেক সহজ। বিচারকের অনিচ্ছাকৃত একটুখানি ভুলে/অসাবধনতায় বিচারপ্রার্থীর জীবননাশসহ অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, এ আশংকায়, অনেক বিবেকবান বিচারক রায়ের পূর্বে মনস্তাপে ভোগেন বা ভুগতে পারেন। এটুকু ব্যতীত তাদের কাজ অন্যদের তূলনায় অনেক অনেক সহজ(বিচারকদের পদমর্যাদার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি)।

এই সহজটা কতগুন সহজ? ”কয়েকগুন”, ”শতগুন” “হাজারগুন”, ….., এরূপ পরিমাপের কোন যন্ত্র নেই। একইভাবে কে কতগুন বেশী মেধাবী, কে কতগুন বেশী সৎ/অসৎ, ইত্যাদি পরিমাপেরও কোন যন্ত্র, হার্ডওয়্যার, সফ্টওয়্যার নেই।

ননটেকনিক্যাল পেশার লোকেরা, বিশেষ করে বিচারক, অফিসে বসে কর্মরত সহকারী পরিচালক, সহকারী সচিব, সহকারী কমিশনার, ইত্যাদি এবং তাদের সমান্তরাল উচ্চপদের লোকেরা চাকুরী বিধিসহ বিভিন্ন বিধি, যা সে পেশার আইন, ইত্যাদিসহ সকল প্রকার আইন নিয়ে কাজ করেন। এব্যাপারে John Clifford Mortimer-British Barrister, Writer, Dramatist. এর বক্তব্য- No brilliance is needed in the law. Nothing but common sense, and relatively clean finger nails.- বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। 

(দ্রস্টব্যঃ-আমাদের এ লিখাটি পূর্বের একটি লিখার অনুরূপ মনে হতে পারে, কিন্তু একটু পার্থক্য আছে)।

Related posts