দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি ও নিম্ন আদালতের দুর্নীতি দমনে সহায়তা প্রসঙ্গে।

১। মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা।

২। মাননীয় চেয়ারম্যান জনাব ইকবাল মাহমুদ,

দুর্নীতি দমন কমিশন, ১, সেগুন বাগিচা, ঢাকা।

বিষয়ঃ-দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি ও নিম্ন আদালতের দুর্নীতি দমনে সহায়তা প্রসঙ্গে।

(ক) হযরত মুহম্মদ(সঃ) বলেছেন যে, কেয়ামতের বিভিষীকাময় দিনে আল্লাহ যে ৭শ্রেনীর লোককে তাঁহার আরশের ছায়ায় রাখবেন, তাদের মধ্যে ১ম শ্রেনী হচ্ছেন ন্যায় বিচারক(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। (খ) যারা ন্যায় বিচার করেনা তারা কাফের(আল কোরআন-সূরা আল মায়েদা)। (গ) অসৎ ব্যক্তি অপরকেও নিজের মত অসৎ মনে করে-হযরত আলী(রাঃ)। (ঘ) বিচারক তার আচরনের(বিচার কাজ) মাধ্যমে সমালোচনার জবাব দেবেন-ব্রিটিশ বিচারপতি লর্ড আলফ্রেড ডেনিং। (ঙ) No brilliance is needed in the law. Nothing but common sense, and relatively clean finger nails.-John Clifford Mortimer-British Barrister, Writer, Dramatist. (চ) বিচারাধীন মামলার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের জন্য নির্দেশাবলি প্রণয়নের বিষয়টি নাকচ করেছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। (ছ) সৎ লোকের অকর্মন্যতা অসততার চেয়ে ভয়াবহ-নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

মাননীয় মহোদয়,

কথিত আছে যে, পৃথিবীতে কিছু ভালো লোক আছে বলে পৃথিবী এখনও টিকে আছে। তেমনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগে কিছু ভালো বিচারক(উচ্চ ও নিম্ন আদালতে) আছেন বলে বাংলাদেশ এখনও টিকে আছে। নতুবা এদেশ বর্বর জংলী দেশে পরিনত হত। ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে, বিশেষ করে মহান ইসলাম ধর্মে বিচারকদেরকে সর্বোচ্চ আসন ও মর্যাদায় স্থান দিয়েছে। দেশের সংবিধানে বিচারকদেরকে সর্বোচ্চ আইনী/বিচারিক ক্ষমতা  প্রদান করা হয়েছে। এটা সকল বিচারকের জন্য inherent.

বিগত ৭-৮বছর যাবৎ আমরা নিম্ন আদালতের মামলা জট সহ নানা রকম দুর্নীতির বিষয়ে গবেষনা করছি। আমাদের গবেষনায় দেখা গেছে যে, নিম্ন আদালতের দুর্নীতির জন্য প্রধানতঃ(একমাত্র নহে) বিচারকরাই(সবাই নহে) দায়ী। বিগত কয়েক মাসে জনৈক বিচারপ্রার্থীর আকুতি সম্বলিত কিছু চিঠি আমাদের হস্তগত হয়, যা তিনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আপীল বিভাগের সকল মাননীয় বিচারপতি, মাননীয় আইন মন্ত্রী/সচিব, দুদকের মাননীয় চেয়ারম্যান প্রমুখকে লিখেন।

এসকল চিঠির ভিত্তিতে আমরা ২টি মামলার সাথে যুক্ত দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, ৪জন জেলাজজ/বিচারক, দুদকের পিপি ও কোর্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে ভয়ানক প্রকাশ্য দুর্নীতি, অনৈতিকতা, অমানবিকতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, vindictiveness, mean mindedness, narrow mindedness প্রকাশ পেয়েছে, তা থাইল্যান্ডের জঙ্গলের মানব পাচারকারী/জিম্মিকারী, খুনী-ধর্ষকদেরকে, জঙ্গীদেরকেও হার মানাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

দুদক/বিচারকরা ঘুষ খেতেই পারে, but how much? (বাস্তব ঘটনা) সাবেক মহামান্য প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ প্রধান বিচারপতি থাকাকালে স্বয়ং কুমিল্লার তৎকালীন জনৈক সহকারীজজের (বর্তমানে জেলাজজ) বিরুদ্ধে যখন তদন্ত করতে যান, তখন সহকারীজজ এজলাসে আসীন ছিলেন এবং প্রধান বিচারপতিকে দেখে তিনি(সহকারীজজ) আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াননি। প্রধান বিচারপতি সহকারীজজের বিচক্ষনতা দেখে তাহার(সহকারীজজ) বিরুদ্ধে আর কোন তদন্ত করেননি। যদিও এ সহকারীজজ স্পীডমানিরূপ ঘুষ খেতেন এবং তৎকালীন পেশকারের ভাষ্য মোতাবেক সামান্য কিছু টাকা খেতেন এবং সর্বাবস্থায় ন্যায় রায় দিতেন। অপরদিকে ঐদিনই অপর এক সাবজজ(যাদেরকে বর্তমানে যুগ্ম জজ বলে), যিনি বর্তমানে জেলাজজ, প্রধান বিচারপতিকে দেখে এজলাসের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, ফলশ্রুতিতে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। এঘটনা থেকে আমরা বিচারক সম্পর্কে উপরোক্ত (ক) থেকে (ছ) পর্যন্ত অনেক কিছু জানতে পারি।

যেমনঃ- যেকোন বিচারক যখন বিচার কাজে থাকবেন, তখন তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, এমনকি  প্রধান বিচারপতির চেয়েও। কে কি বলল এটা কোন বিষয় নহে বা কে কি অভিযোগ করল এটাও কোন বিষয় নহে। নিজে কতটুকু স্বচ্ছ এটাই বড় বিষয়। এজন্য বলা হয়- দক্ষতা ছাড়া সততা মূল্যহীন।

কোন অনুষ্ঠান/মিটিং/সম্মেলন/ট্রেনিং, ইত্যাদিতে  নিম্ন আদালতের অনেক বিচারককে বলতে শুনেছি যে, অমুক বিচারপতি বা অমুক ভিআইপি মামলার ব্যাপারে তাকে/তাদেরকে টেলিফোন করেছে, তদবীর করেছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বিচারকের দুর্নীতি, দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার জন্য কোন মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে তা সময়মত নিষ্পত্তির জন্য কোন বিচারপতি বা ভিআইপি টেলিফোন/তদবীর করতেই পারেন। নিশ্চয়ই কোন বিচারপতি বা ভিআইপি অন্যায় রায় দেয়ার জন্য টেলিফোন/তদবীর করেননি, করলেও তা বিচারক শুনবেন কেন? প্রকৃতপক্ষে নিম্ন আদালতের বিচারকের দুর্নীতি, দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার জন্য কোন মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে  তা সময়মত নিষ্পত্তির জন্য কোন বিচারপতি বা ভিআইপির টেলিফোন করাকে সেই বিচারক পছন্দ করেন না এবং তাদের দুর্নীতি দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা ঢাকতে ঐরূপ(অমুক বিচারপতি বা অমুক ভিআইপি মামলার ব্যাপারে তাকে/তাদেরকে টেলিফোন/তদবীর করেছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি) অভিযোগ করেন।

ঘুষ খাওয়াকে কোন কোন বিচারক দুর্নীতি বা অপরাধ মনে করলেও সপ্তাহে ৩০-৩২ঘন্টার স্থলে মাত্র ৩-৪ঘন্টা বা তারও কম সময় এজলাস করাকে এসব তথাকথিত “সৎ বিচারকরা” দুর্নীতি বা অপরাধ বলে মনে করেননা। এটা তাদের কমনসেন্সের অভাব। দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা আর্থিক অসততার চেয়ে ভয়াবহ।

১৯৪৭সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২)(১) ধারার উপাদানে অপরাধের উদ্দেশ্যের mensrea বা criminal intention-এর কথা বলা হয়েছে। পূর্বে বিভাগীয় স্পেশাল জজ কোর্ট সিলেটে বর্তমানে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল সিলেটে বিচারাধীন স্পেশাল ২১/০৯, ২৩/০৯ নং মামলা ৪-৬-১২মাস বা এরূপ সময়ে নিষ্পত্তির সকল সুযোগ থাকা সত্বেও আমলে নেওয়ার ৭(সাত)বছরেও নিষ্পত্তি না করে ৪জন জেলাজজ ১৯৪৭সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২)(১) ধারার অপরাধ করেছেন। এটা ফৌজদারী অপরাধ। ইহা ছাড়াও ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার মাধ্যমে চাকুরীচ্যুতিযোগ্য অপরাধও করেছেন।

দুর্নীতির মামলা সমুহ অতিরিক্ত কোন অর্থ/জনবল ছাড়াই সহজতম উপায়ে সংক্ষিপ্ততম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এতে নূতন নূতন অনেক দুর্নীতির জন্মনিরোধ হবে। আমরা এব্যপারে দুদক ও বিচার বিভাগকে সাহায্য করতে চাই।

এব্যপারে মাননীয় মহোদয়গনের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

Related posts